মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুরক্ষাবাদী অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি আমদানীকৃত পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক। পণ্য বাবদ বাড়তি খরচ বিদেশী রফতানিকারকদের ওপর বর্তাবে বলে ট্রাম্প জানালেও বাস্তবে ঘটছে এর উল্টো। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের এক বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্প আরোপিত শুল্কের প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের কাঁধেই চেপেছে। অন্যদিকে নির্দলীয় গবেষণা সংস্থা ট্যাক্স ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, মার্কিন পরিবারপ্রতি প্রায় ১ হাজার ডলারের অতিরিক্ত করের সমতুল্য চাপ সৃষ্টি করেছে শুল্ক। অর্থাৎ শুল্কনীতি নিয়ে যতই রাজনৈতিক বিতর্ক থাকুক, এর প্রকৃত মূল্য পরিশোধ করছে মার্কিনরা। খবর দ্য হিল।
শুল্কের প্রভাব সম্পর্কিত নিউইয়র্ক ফেডের গবেষণায় বলা হয়, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) শুল্ক বাবদ সৃষ্ট ব্যয়ের বেশির ভাগই মার্কিনদের ওপর বর্তায়। গত বছরের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কজনিত অর্থনৈতিক বোঝার ৯৪ শতাংশ বহন করছিল। তবে বছরের শেষার্ধে আমদানি পণ্যের দামে শুল্কের প্রভাব কিছুটা কমে আসে। এর কারণ বিদেশী রফতানিকারকরা শুল্কের তুলনামূলক বড় একটি অংশ বহন শুরু করেছে।
নিউইয়র্ক ফেডের এ গবেষণা সাম্প্রতিক অন্যান্য গবেষণার ফলাফলকেও সমর্থন করে। যেখানে বলা হয়েছে, শুল্কের ৯০ শতাংশেরও বেশি অর্থনৈতিক বোঝা মার্কিন ব্যবসা ও ভোক্তারাই বহন করছে।
জার্মান প্রতিষ্ঠান কেইল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির গবেষণা পরিচালক জুলিয়ান হিন্জ বলেন, ‘বিদেশীরা রফতানি বাবদ শুল্ক পরিশোধ করে এমন দাবি একটি মিথ।’
হোয়াইট হাউজে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রবেশের পর গত বছরের জানুয়ারিতে দ্রুত আমদানি পণ্যে শুল্ক পদক্ষেপ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরুতে এর শিকার হয় কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের মতো বড় বাণিজ্য অংশীদার। এরপর এপ্রিলে ‘লিবারেশন ডে’ অ্যাখ্যা দিয়ে প্রায় সব দেশের ওপর উচ্চহারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ধার্য করেন তিনি। কড়াকড়ি এ শুল্কনীতি রফতানিকারক দেশ ও মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানীকৃত পণ্যে গড় শুল্কহার ২ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশে পৌঁছয়। মাঝে কিছু ওঠানামা থাকলেও বছরজুড়ে সামগ্রিক শুল্ক প্রবণতা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। নিউইয়র্ক ফেডের গবেষকরা বলছেন, ‘উচ্চ শুল্কের অর্থনৈতিক বোঝার মূল অংশ এখনো মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারাই বহন করছে।’
ট্যাক্স ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ট্রাম্পের শুল্ক গড়ে প্রতি মার্কিন পরিবারের ওপর প্রায় ১ হাজার ডলার অতিরিক্ত করের সমতুল্য বোঝা সৃষ্টি করেছে। নীতিগুলো বহাল থাকলে ২০২৬ সালে তা বেড়ে পরিবারপ্রতি ১ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছতে পারে।
জরিপে দেখা যাচ্ছে, ক্রয়ক্ষমতা এখনো আমেরিকানদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের পারফরম্যান্স নিয়ে জনমতেও নেতিবাচকতা বাড়ছে। যদিও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে শুল্কনীতিকে ‘মার্কিন অর্থনীতির অলৌকিক সাফল্য’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। বাড়তি শুল্ক শেয়ারবাজারে ধস ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ডেকে আনবে বলে বিশ্লেষকদের দেয়া পূর্বাভাসেরও সমালোচনা করেন তিনি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে শুল্কের প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পের শুল্ক কৌশল পরিবর্তন হয়েছে। কখনো শুল্ক আরোপ, কখনো স্থগিত বা সম্প্রসারণ, আবার কখনো শিথিল করা হয়েছে। ফলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা অনুযায়ী প্রভাব পুরোপুরি পরিলক্ষিত হয়নি।
অবশ্য ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্টের’ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্স রিফান্ড গড়ে ১ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা স্বল্পমেয়াদে ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। এ বিষয়ে ট্যাক্স ফাউন্ডেশন সতর্ক করেছে, নতুন করছাড়ের অর্থনৈতিক সুফলের বড় অংশই খর্ব করতে পারে শুল্ক। আবার শুল্ক বাবদ আয় দিয়েও পুরো করছাড়ের ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।
ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের ফেডারেল ট্যাক্স পলিসি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিকা ইয়র্ক বলেন, ‘২০২৫ সালে শুল্ক ও করছাড় মিলিয়ে নিম্ন আয়ের করদাতারা গড়ে আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকবেন।’
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সান ফ্রান্সিসকোর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুল্ক বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা পর্যায় থেকে বিনিয়োগ পর্যন্ত সামগ্রিক চাহিদাকে প্রভাবিত করতে পারে। স্বল্পমেয়াদে এর ফল হবে উচ্চ বেকারত্ব কিন্তু নিম্ন-মূল্যস্ফীতি।
গত নভেম্বর সংস্থাটি জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতিতে স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ স্থগিত রাখতে পারে। কারণ শুল্কনীতি তাদের সরবরাহ চেইনে পুনর্বিন্যাস আনতে বাধ্য করবে।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন, পরে কিছু ক্ষেত্রে সরেও আসেন। গত বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ছয় রিপাবলিকান সদস্য কানাডার ওপর প্রতিশ্রুত শুল্ক ঠেকানোর উদ্যোগে অংশ নেন। প্রতিক্রিয়ায় ওই আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে ‘পরিণতি’ ভোগ করার হুমকি দেন ট্রাম্প। এছাড়া ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে মার্কিন সর্বোচ্চ আদালত শিগগিরই রায় দিতে পারে।